সর্বশেষ

6/recent/ticker-posts

চুক্তির সংজ্ঞা(Definition of Contract) এবং চুক্তির অত্যাবশ্যকীয় উপাদানগুলো(Essential elements of a contract) আলোচনা করুন।

চুক্তির সংজ্ঞা(Definition of Contract) এবং চুক্তির অত্যাবশ্যকীয় উপাদানগুলো(Essential elements of a contract) আলোচনা করুন।

চুক্তির সংজ্ঞা(Definition of Contract)

Contract চুক্তি [আরবী প্রতিশব্দ “আকুদ] শব্দটি ল্যাটিন শব্দ Contractum থেকে এসেছে যার আভিধানিক অর্থ মিলন বা একত্রিকরণ/বন্দোবস্ত/ ঠিকা/ নিয়মপত্র বা একরারনামা।একটি চুক্তির মাধ্যমেই পক্ষগণকে একত্রিত করে আইনগত বন্ধনের সৃষ্টি হয়। কোন বিষয়ে দুই বা ততোধিক পক্ষসমূহের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে এক প্রকার বাধ্যবাধকতা তৈরি করতে আইনত প্রয়োগযোগ্য সম্মতিই হলো চুক্তি।

চুক্তি আইন-১৮৭২ এর ২(জ) ধারায় চুক্তি নিয়ে এইভাবে বলা হয়েছে যে “An agreement enforceable by law is a contract”(চুক্তি হলো আইনের মাধ্যমে বলবৎযোগ্য একটি সম্মতি) ।

Frederik Pollock এর মতে ‘আইন দ্বারা প্রয়োগযোগ্য প্রতিটি সম্মতি ও প্রতিশ্রুতিই হলো চুক্তি(Every agreement & promise enforceable by at law is a contract).

Salmond বলেন যে, বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে সুনির্দিষ্ট দায়-দায়িত্ব সৃষ্টি করে যে সম্মতি সাধিত হয় তাকেই চুক্তি বলে(A contract is an agreement creating & defining obligations between the parties).

উপরের সংজ্ঞাগুলো বিশ্লেষণ করলে আমরা মূলত দুইটি Basic বিষয় দেখতে পাই তা হলোঃ-

  • একটি চুক্তিতে অবশ্যই একটি সম্মতি(agreement) থাকতে হবে।
  • সম্মতিটি আইনের মাধ্যমে বলবৎযোগ্য(enforceable at law) হতে হবে।

এইবার আমরা বলতে পারি যে, যে কোন চুক্তির উৎপত্তি হয় সম্মতি থেকেই। দুই বা ততোধিক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কোন কাজ করা বা না করার বিষয়ে একমত/সম্মত হয়ে থাকে এবং ঐ সম্মতিটি যখন আইন দ্বারা enforceable হবে তখন তাকে চুক্তি বলবো।

চুক্তির প্রক্রিয়া



প্রথমে যখন একটি পক্ষ অন্য একটি পক্ষের কাছে একটি প্রস্তাব দেয়,তখন তা গ্রহণ করা হলে সেটি সম্মতির মাধ্যমে চুক্তির দিকে ধাবিত হয়। আবার সেটি যদি আইনের মাধ্যমে আদালতে প্রয়োগযোগ্য হয়, তবেই এটি একটি চুক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।

চুক্তির অত্যাবশ্যকীয় উপাদান(Essential elements of a contract)

১। দুই বা ততোধিক পক্ষ (Plurality of Members) :

একটি চুক্তিতে দুই বা ততোধিক পক্ষ থাকতে হবে । কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নিজে নিজের সাথে কখনোই চুক্তিতে আবদ্ধ হতে পারে না। আমরা যদি কোন একটি ক্রয়-বিক্রয় চুক্তির কথা ভাবি তাহলে সেখানে দেখব এক পক্ষে ক্রেতা অন্যপক্ষে বিক্রেতা থাকবে।

২। প্রস্তাব উপস্থাপন (Offer)

একটি চুক্তিতে আবদ্ধ হতে হলেকমপক্ষে দুটি পক্ষের মধ্যে এক পক্ষ অপর পক্ষের কাছে কোন কিছু করার জন্য কিংবা থেকে বিরত থাকার জন্য দেশের প্রচলিত সামাজিক, ধর্মীয় ও নৈতিক রীতিনীতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ এবং আইনসঙ্গত প্রস্তাব উপস্থাপন করতে হবে। যদি এর ব্যত্যয় হয় তবে সেই চুক্তি বাংলাদেশ চুক্তি আইন অনুসারে আদালতে কার্যকর হবে না।


৩।স্বীকৃতি (Acceptance)

চুক্তিতে একটি পক্ষ প্রস্তাবকারী হিসেবে একটি প্রস্তাব উপস্থাপন করলে অপরপক্ষকে তা দেশের বলবৎ চুক্তি আইন মোতাবেক গ্রহণ করে স্বীকৃতি দিতে হবে । তাহলে তা চুক্তিতে পরিণত হবে।

৪।আইনগত সম্পর্ক (Legal relationship)

চুক্তিতে আবদ্ধ হতে ইচ্ছুক দুই পক্ষকে প্রস্তাব উপস্থাপনা ও গ্রহণের মাধ্যমে একটি আইনগত সম্পর্ক সৃষ্টির ইচ্ছা বা আকাঙ্ক্ষা থাকতে হবে।সেখানেকোন পক্ষ যদি সম্মতি ভঙ্গ করে তাহলে ক্ষতিপূরণের বিষয়টি সামনে চলে আসবে।মনে রাখা উচিত,দুই পক্ষের মধ্যে শুধু ধর্মীয়, সামাজিক ও নৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে কোন বিষয়ে একমত হলেই তা চুক্তি আইনের আওতায় পড়বে না।


৪। আইনগত প্রতিদান (Legal consideration)

বৈধ 
চুক্তিতে সংশ্লিষ্ট উভয়পক্ষ পরস্পরের নিকট থেকে কিছু পেতে এবং কিছু দিতে হবে। বর্তমান, অতীত কিংবা তবিষ্যতে কোন কিছু পাওয়ার জন্য কিছু দেওয়ার নামই হলো প্রতিদান। তবে খেয়াল রাখতে হবে প্রতিদান টি অবশ্যই আইনসঙ্গত হতে হবে।

৫।চুক্তি সম্পাদন যোগ্যতা (Eligibility to execute contract)

চুক্তি আইন-১৮৭২ এর ১১ ধারা মোতাবেক তিন শ্রেণীর ব্যক্তি (নাবালক,মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তি ও প্রচলিত আইন অনুসারে অযোগ্য ব্যক্তি-যেমন দেউলিয়া ইত্যাদি) চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়ার ক্ষেত্রে অযোগ্য। সুতরাং আইনের দৃষ্টিতে চুক্তি সম্পাদনের জন্য সাবালক ও সুস্থ এবং আইন কর্তৃক যোগ্য ব্যক্তিরাই চুক্তি করতে পারেন।

৬। উদ্দেশ্যের বৈধতা ( Legality of the object )

দুই বা ততোধিক পক্ষের মধ্যে যে চুক্তিটি হবে তার উদ্দেশ্য অবশ্যই বৈধ হতে হবে। অবৈধ, নীতি ও গণস্বার্থবিরোধী উদ্দেশ্য নিয়ে প্রণীত চুক্তি আদালত কর্তৃক গ্রহণযোগ্য নয়। তাই চুক্তির উদ্দেশ্য ও বিষয়বস্তু অবশ্যই আইন সঙ্গত হতে হবে তা না হলে আদালতে গ্রাহ্য হবে না।

৭। স্বাধীন সায় বা সম্মতি (Free Consent) :

একটি চুক্তিতে আবদ্ধ হতে হলে তথা প্রস্তাব উপস্থাপন বা সম্মতি প্রদানে অবশ্যই দুটি পক্ষ কে স্বাধীনভাবে সায় বা সম্মতি দিতে হবে। এক্ষেত্রে চুক্তি আইনের ১৪ ধারা মোতাবেক যখন কোন সম্মতি বলপ্রয়োগ, অনুচিত প্রভাব, মিথ্যা বর্ণনা, প্রতারণা বা ভুলের বশবর্তী না হয়ে প্রদত্ত হলেই কেবল স্বাধীন সম্মতি হিসেবে ধরে নেওয়া হবে। স্বাধীন সম্মতি বা সায় ছাড়া দোষী পক্ষের চুক্তি বাতিল বলে গণ্য হবে। তবে নির্দোষ পক্ষ আপত্তি না করলে তাদের সম্মতি আইন দ্বারা গ্রহণযোগ্য হতে পারে।

৮। নির্দিষ্টতা(Certainty)

যে কোন বৈধ চুক্তির বিষয়বস্তু অবশ্যই সুনির্দিষ্ট হয়ে থাকে। চুক্তি আইনের ২৯ ধারা অনুযায়ী বিষয়বস্তুসহ সম্মতি নির্দিষ্ট না থাকলে সংশ্লিষ্ট চুক্তিটি বাতিল বলে গণ্য হয়। চুক্তির শর্তে কোন অস্পষ্টতা বা অনিশ্চয়তা থাকার কারণে স্পষ্ট বা নির্দিষ্টভাবে বুঝা না গেলে ঐ সম্মতি আদালত কর্তৃক গ্রহণযোগ্য হবে না এবং চুক্তি বাতিল বলে গণ্য হবে।

৯। সম্পাদনের সম্ভাব্যতা (Possibility of performance)

চুক্তি হতে হলে চুক্তির বিষয়বস্তু(প্রস্তাব বা প্রতিশ্রুতি) অবশ্যই পালনযোগ্য হতে হবে। এ বিষয়ে চুক্তি আইনের 56 ধারা মতে, অসম্ভব কর্ম সাধনের চুক্তি বাতিল হিসেবে গণ্য হবে। তাই কোন পক্ষ যদি এমন প্রস্তাব বা প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকে যা পালন করা অসম্ভব,তবে সেই প্রস্তাব বা প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে কোন আইনগত চুক্তিও অসম্ভব।

১০। লিখিত ও নিবন্ধিত চুক্তি (Written and registered contract)

দৈনন্দিন জীবনে আমরা কোন না কোন কাজে চুক্তিতে আবদ্ধ হচ্ছে যেখানে চুক্তিগুলো কখনো ব্যক্ত আবার কখনো অব্যক্ত হয়ে থাকে।আবার বিশেষ ক্ষেত্রে যেমন বিয়ের চুক্তি জমি বিক্রয় চুক্তি ইত্যাদি লিখিত ও নিবন্ধিত হতে পারে। এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে চুক্তি লিখিত নিবন্ধিত না থাকলে এর প্রস্তাব বা বিষয়বস্তু কোনভাবে লংগিত হলে আদালত কর্তৃক এ ধরনের চুক্তি গ্রহণযোগ্যতা পাবে না।

Post a Comment

0 Comments